যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স। তাঁর এ সিদ্ধান্তে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট শিবিরে বিভেদ দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
রোববার ডেট্রয়েটের একটি গির্জায় রজার্সের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সমর্থন জানান স্টিভেন্স। এর আগে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে আব্দুল এল-সায়েদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে স্টিভেন্স বলেন, ‘আব্দুলের প্রচারণায় আমার কোনো জায়গা নেই।’
স্টিভেন্সের সমর্থনের কয়েক ঘণ্টা পর আইওয়ায় এক রাজনৈতিক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এর আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, স্টিভেন্সকে সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাবেন। তাঁর মতে, এটি ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এল-সায়েদ ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে ফেলতেন।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসন এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনে ভোট হবে। বর্তমানে উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। মিশিগান ও আলাস্কাসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের ফলাফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের আইন প্রণয়নের কর্মসূচিতে বাধা দিতে পারবেন। পাশাপাশি প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগও পাবেন তাঁরা। এতদিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন কর্মসূচিতে সমর্থন পেয়ে এসেছে।
স্টিভেন্সের রজার্সকে সমর্থন জানানোর দিনই এল-সায়েদের সঙ্গে দলীয় ঐক্য প্রদর্শনের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে মতবিরোধের জেরে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়। স্টিভেন্স এল-সায়েদকে একটি বাইরের গোষ্ঠীর বিজ্ঞাপনের নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই বিজ্ঞাপনে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়েছিল।
রোববার রাতে সিএনএনকে স্টিভেন্স বলেন, বিজ্ঞাপনটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। অনেক ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে চান, অথচ তাঁদের পরোক্ষভাবে জানানো হচ্ছে যে দল বা প্রচারণায় তাঁদের কোনো জায়গা নেই।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, এল-সায়েদের প্রচারশিবির সম্প্রতি স্টিভেন্সকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তাঁর কোনো অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার অনুরোধ করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, প্রচারণার মূল বিষয়গুলো থেকে যেন মনোযোগ সরে না যায়।
রজার্স স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বর্তমান আমেরিকার রাজনীতিতে এটি সাহসিকতার পরিচয়। তাঁর অভিযোগ, কোনো দল বা দলের একটি অংশ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ালে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, আইওয়ায় এক জনসভায় ট্রাম্প আবারও ভিত্তিহীনভাবে এল-সায়েদকে ‘জিহাদি’ বলে আখ্যা দেন। আরব আমেরিকান ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ট্রাম্প ও অন্য রিপাবলিকান নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় এ মন্তব্য আসে।
স্টিভেন্সের সমর্থন প্রত্যাহারে এল-সায়েদের জনসমর্থনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। রোববার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন এল-সায়েদ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রজার্সের সমর্থন ৪২ শতাংশ।
এল-সায়েদের প্রচারশিবিরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, স্টিভেন্স রজার্সকে সমর্থন জানানোর পরবর্তী চার ঘণ্টায় তাঁদের প্রচারণায় ১২ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ হয়েছে। আগস্টে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারির পর এটিই তাঁদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তহবিল সংগ্রহের দিন।
স্টিভেন্সের সমর্থনের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এল-সায়েদ। এমএস নাওকে তিনি বলেন, এই নির্বাচন তাঁকে, রজার্সকে কিংবা স্টিভেন্সকে নিয়ে নয়; বরং মিশিগানের সাধারণ মানুষকে নিয়ে। তাঁদের গির্জা, সিনাগগ ও বাড়িতে গিয়ে মানুষের প্রয়োজন ও অধিকার সম্পর্কে জানার কথা তুলে ধরেন তিনি।
সিএনএন ও দ্য হিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাঁর কংগ্রেসনাল কার্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মী পদত্যাগ করেছেন। অনেক ভোটারও তাঁর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ডেট্রয়েটের শহরতলি ওয়ারেনে এল-সায়েদের পক্ষে ভোট দেওয়ার পর ৭২ বছর বয়সী পামেলা জনসন স্টিভেন্সকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দেন।
অন্যদিকে, আলাস্কার সিনেট নির্বাচন ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টাও রোববার ব্যর্থ হয়েছে। একজন ফেডারেল বিচারক মার্কিন বিচার বিভাগের দায়ের করা একটি মামলা খারিজ করে দিয়েছেন। মামলায় দাবি করা হয়েছিল, রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান এস. সুলিভান অল্প ব্যবধানে পরাজিত হলে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যয়ন স্থগিত রাখতে হবে।
বিচার বিভাগের যুক্তি ছিল, ব্যালট পেপারে ‘ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়র’ নামে আরেকজন প্রার্থী থাকায় ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে ভূমিকা রেখেছিল, যাতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
সিনেটর সুলিভান জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলাফল তিনি মেনে নেবেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে ফৌজদারি তদন্তের জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে আলাস্কার রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডানলিভি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মেরি পেলটোলা জয়ী হলে তিনি হয়তো ফলাফল প্রত্যয়ন করবেন না। অন্যদিকে, ফলাফল প্রত্যয়ন না করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি সুলিভান।
সুলিভান অভিযোগ করেছেন, ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়র নিজের নামের সাদৃশ্য ব্যবহার করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ব্যালট পেপারে একজন বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী প্রার্থীকে রাখা হয়েছে। এ কারণে তিনি অনেক ভোট হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আলাস্কার ভোটারদের এই কৌশল সফল হতে না দেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে পেলটোলা নির্বাচনে ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রকে প্রার্থী করার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, সুলিভান জুনিয়রও জানিয়েছেন, পেলটোলার প্রচারশিবিরের সঙ্গে তাঁর কোনো সমন্বয় ছিল না।