বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও মামলা করার বিষয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। পুলিশের অনুরোধের পরও পরিবার সাড়া না দেওয়ায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেফাজতে থাকা তাহসিফের বন্ধু ও স্থানীয় ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মধ্যরাতে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে নিজের অবস্থান নিয়ে সংবাদমাধ্যমে এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন দ্বীপ। পরে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, তার বক্তব্যে ঘটনার কিছু তথ্য আড়াল করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে মামলা না হওয়ায় তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
মামলা করতে অনীহা পরিবারের
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, আপাতত মামলা করার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ নেই। তবে রাষ্ট্র স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে উদ্যোগ নেবে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘মামলার বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব। মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ বিষয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এরকম ঝামেলার মধ্যে পড়তে?’
পরিবার মামলা না করলে পুলিশ কী পদক্ষেপ নেবে, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে। পরিবার মামলা করতে এগিয়ে না এলে নৌ পুলিশই হয়তো অপমৃত্যুর মামলা করতে পারে।
তবে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন জানান, তাঁরা মরদেহ উদ্ধার করলেও ঘটনাস্থল উত্তরখান থানা এলাকায় হওয়ায় বিষয়টি ওই থানার অধীনে পড়বে।
অন্যদিকে, ডিএমপির উত্তরখান থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার মামলা করতে বলা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এখনো কোনো মামলা হয়নি। মামলার বিষয়ে পরিবারের কেউ আমাদের কাছে আসেননি।’
পরিবার মামলা না করলে পুলিশের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
পরিবার মামলা না করলেও কি পুলিশ মামলা করতে পারে?
সাধারণত নিহত ব্যক্তির বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী বা অন্য নিকটাত্মীয় থানায় মামলা করেন। তবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়ে পরিবারের সদস্য ছাড়াও তৃতীয় ব্যক্তি, প্রতিবেশী কিংবা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী থানায় অভিযোগ করতে পারেন। এমনকি পরিবার এগিয়ে না এলেও পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা করতে পারে।
এ বিষয়ে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সাধারণত পরিবারের পক্ষ থেকেই মামলা করতে বলা হয়। পরিচয় শনাক্তের মতো কাউকে পাওয়া না গেলে পুলিশ অন্য কাউকে বাদী করে অথবা নিজেরাই বাদী হয়ে মামলা করে।
তিনি বলেন, ‘যার ভাই বা যার সন্তান, তার প্রতি দরদ বেশি নিশ্চয়ই বাইরের কারও থাকবে না। তিনি সাক্ষী উপস্থাপন করবেন, ঘটনার বিবরণ দেবেন, দলিল উপস্থাপন করবেন, কবে কী ঘটনা—সেসব তথ্য উপস্থাপন করবেন। তিনিই তাঁর ভাই বা সন্তানের জন্য আদালতে ন্যায়বিচার চাইবেন। আর বাইরের লোক বাদী হলে তারা কেউ কাউকে হয়তো চেনেই না।’
ঘটনার রাতে কী হয়েছিল
এর আগে বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমকে দ্বীপ জানিয়েছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি।
তবে ওই রাতেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পরে দ্বীপ স্বীকার করেন, মধ্যরাতে তিনি তাহসিফের সঙ্গে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। এলাকাটি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে দ্বীপকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
দ্বীপের দেওয়া তথ্যের বরাতে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে তাঁরা সেখানে অবস্থান করার সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া করে। এ সময় দ্বীপ তুরাগ তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। পরে সুযোগ বুঝে দ্বীপ সেখান থেকে সরে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাসায় ফেরেন।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো তদন্তের বিষয়। পরিবার মামলা না করলে কোন সংস্থা কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে, সে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।