ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য সংঘাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জেরে নিজেদের স্বর্ণের মজুত কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। এরই মধ্যে নেদারল্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত তাদের স্বর্ণের একটি বড় অংশ লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে। এর আগে একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল ফ্রান্স ও জার্মানিও। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বড় কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, উত্তর আমেরিকায় সংরক্ষিত তাদের প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন সম্প্রতি লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকটির মতে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে গুরুতর কোনো সংকট দেখা দিলে স্বর্ণের মজুত আরও সহজে ব্যবহার করা যায়।
এ বিষয়ে ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেন: "কখনো এসব স্বর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না—এমনটাই আমরা আশা করি। তবে দেশের স্থিতিস্থাপকতা ও যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।"
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কর্মকর্তা জোসেফ কাভাতোনির মতে, যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা কিছু দেশের স্বর্ণ স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললেও আসন্ন কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কায় এমনটা করা হচ্ছে না। বরং নিজেদের রিজার্ভ কীভাবে পরিচালনা ও সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে দেশগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
নেদারল্যান্ডস ছাড়াও এ বছরের শুরুতে ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষিত তাদের স্বর্ণের একটি অংশ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বুন্ডেসব্যাংক’ নিউইয়র্ক ও প্যারিস থেকে ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছিল।
কোনো বৈশ্বিক সংকটের সময় দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচা বা অন্য সম্পদের সঙ্গে বিনিময় করতে হলে লন্ডন বিশেষভাবে সুবিধাজনক। এ কারণেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। মধ্য লন্ডনের ৩০০ বছর পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের নিচে প্রায় চার লাখ স্বর্ণের বার সংরক্ষিত রয়েছে, যার বাজারমূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি।
স্বর্ণ এক দেশ থেকে অন্য দেশে নেওয়ার বিষয়টি সব সময় সশরীরে পরিবহনের মাধ্যমে হয় না। এর প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো:
-
হিসাব সমন্বয়: নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে একই পরিমাণ নতুন স্বর্ণ কিনেছে। এতে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাস্তবে স্বর্ণ পরিবহনের প্রয়োজন পড়েনি।
-
সশরীর পরিবহন: কিছু ক্ষেত্রে কড়া নিরাপত্তায় স্বর্ণ পরিবহনও করা হয়। যেমন—২৭ টনের বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে প্রথমে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে এবং পরে সেখান থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছে।
বাড়ছে স্বর্ণ কেনা ও দাম বৃদ্ধির পূর্বাভাস
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার টন স্বর্ণ কিনেছে, যা আগের দশকে ছিল মাত্র ৫০০ টন।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কেনার কারণে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।