যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পেছনে ফেলে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দলটি। এতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে হোয়াইট হাউস। খবর আলজাজিরা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেয়েছে দলটি। চার বছর পর আবারও নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে তারা।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা হাকিম জেফরিস প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁর।
১০০ সদস্যের মার্কিন সিনেটে এবার ৩৫টি আসনে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত ও দুটি বিশেষ নির্বাচন। ভোটের আগে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ৫৩টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোটবদ্ধ দুই স্বতন্ত্র সিনেটরসহ বিরোধী জোটের আসন ছিল ৪৭টি।
নির্বাচনে টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন।
নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট রয় কুপার। ওহাইয়োতে রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়ে সিনেটে ফিরেছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন। আইওয়ায় অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করেছেন জশ টুরেক। মেইন অঙ্গরাজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিচারপতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন অনুমোদনে সিনেটের ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতাও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা অ্যাবটের পরাজয় অঙ্গরাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটদের বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওহাইয়োতে রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীকে হারিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাক্টন। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম অঙ্গরাজ্যটিতে গভর্নর পদে জয় পেলেন কোনো ডেমোক্র্যাট। জর্জিয়ায় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হবেন।
নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটও জয় পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক আদম হামাওয়ি। নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন তিনি।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আলোচনায় আসেন সাবেক এই সেনা চিকিৎসক।
নিউইয়র্কের বিভিন্ন আসনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট ও প্রগতিশীল ধারার প্রার্থীরা। তাঁদের প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। থাকলে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম।’ অর্থাৎ নিজে প্রার্থী না থাকায় দল প্রত্যাশিত ফল পায়নি বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একটি কারণ কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান এর একটি অংশ ছিল।’ তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি নিঃসন্দেহে ওই ফলাফল মেনে নিতে প্রস্তুত।’ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুই দল সম্ভবত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। এবারও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের অক্টোবরের এক জরিপে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন প্রতি ১০ জন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র তিনজন। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এবারের নির্বাচনী প্রচারেও রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাড ইমপ্যাক্টের হিসাবে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার।
নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে আগামী বছরের ৩ জানুয়ারি। ১২০তম কংগ্রেসের অধিবেশন শুরুর পর ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দুই কক্ষের মুখোমুখি হতে হবে ট্রাম্প প্রশাসনকে। ফলে বাজেট, আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া এগোনো কঠিন হতে পারে।
