যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের সদস্যদের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নরও নির্বাচিত করবেন ভোটাররা। নির্বাচনি প্রচারে উত্তেজনা, দলীয় কোন্দল ও ভোটের নিয়ম নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এবারের নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প মেয়াদের শেষ দুই বছরে কতটা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন, তারও একটি ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে এবারের ভোট।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদেও ভোট হয়।
কংগ্রেসের দুই কক্ষ হলো প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। এ ছাড়া ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচিত করবেন ভোটাররা।
বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টি—যা গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি (জিওপি) নামেও পরিচিত—কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে। ফলে এবারের নির্বাচনে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। বিপরীতে বিরোধী দল আসন বাড়িয়ে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। সেই হিসাবে ডেমোক্র্যাটদের সামনে কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কংগ্রেসে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন। একই সঙ্গে তার প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগও পাবেন।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে নির্বাচন হলেও প্রায় ৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলক তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান অবস্থান থেকে নিট তিনটি আসন বাড়াতে হবে। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের ফলই নির্ধারণ করে দিতে পারে, কোন দল এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাবে।
সিনেটের হিসাব অবশ্য তুলনামূলক জটিল। ১০০ সদস্যের এ কক্ষে এবার ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ১২টি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য আসনগুলোর বেশির ভাগই দুই দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সম্মিলিত আসন ৪৭টি।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের আসন বাড়িয়ে ৫১টিতে পৌঁছাতে হবে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সর্বোচ্চ তিনটি আসন হারিয়েও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন।
সিনেটে দুই দলের আসন ৫০-৫০ হলে ভোটের অচলাবস্থা নিরসনে ভোট দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে এ দায়িত্বে রয়েছেন রিপাবলিকান জেডি ভ্যান্স। এ কারণে প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক ও নির্বাচনি পূর্বাভাস দেওয়া বিভিন্ন বাজারের ধারণা, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যেতে পারে।
এমনটি হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে তার প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন বিরোধীরা। তদন্ত, সমন জারি ও কংগ্রেসের শুনানির মতো কার্যক্রমও বাড়তে পারে।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা শক্ত অবস্থানে গেলে ট্রাম্পকে আবার অভিশংসনের উদ্যোগের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই অভিশংসন বা অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
গত নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কংগ্রেসের আসন নির্ধারণে ব্যবহৃত নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ।
১০টি অঙ্গরাজ্যে কংগ্রেসের নির্বাচনি এলাকার মানচিত্র নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘রিডিস্ট্রিক্টিং’।
সাধারণত প্রতি ১০ বছর পর নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে রিপাবলিকানদের সুবিধা দিতে টেক্সাসে নতুন মানচিত্র তৈরির পর অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোতেও এর প্রভাব পড়ে। এতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ভোটের ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের লড়াইয়ে রিপাবলিকানরা নিট পাঁচটি অতিরিক্ত আসনের সুবিধা পেয়েছেন। ফলে ভোটের আগেই দলটি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এ ছাড়া ফেডারেল আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রায় এবারের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের দাবি, এসব রায়ের ফলে ভোটাধিকার আইন দুর্বল হয়েছে। জাতিগত বৈষম্য থেকে ভোটারদের সুরক্ষা দিতে ঐতিহাসিকভাবে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।
ভোটারদের যোগ্যতা এবং ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর সুযোগ নিয়েও বিতর্ক চলছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হচ্ছে না। ট্রাম্পের নামও ব্যালটে থাকছে না। তবে এবারের নির্বাচনি প্রচারের বড় অংশজুড়েই রয়েছেন তিনি।
জাতীয় জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও রিপাবলিকানদের জন্য নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি।
ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টাদের দাবি, তার ‘মাগা’ সমর্থকদের সক্রিয় করতে পারেন একমাত্র তিনিই। ঐতিহাসিকভাবে কম ভোটার উপস্থিতির মধ্যবর্তী নির্বাচনে এ সমর্থন রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন ট্রাম্প। ‘ট্রাম্প-এ-পালুজা’ নামের ওই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলের নির্বাচনি প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি।
ভোটারদের প্রতি ট্রাম্পের বার্তা, ব্যালটে তার নাম না থাকলেও তার প্রশাসন, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবারের নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে।
দেশজুড়ে কংগ্রেসের অধিকাংশ আসনের নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। নিজের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। এসব সমর্থন প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প ও তার নীতিকে নির্বাচনি প্রচারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের কাছে এবারের নির্বাচন ট্রাম্পের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং তার রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পেলে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দলটি বাড়তি রাজনৈতিক গতি পাবে। একই সঙ্গে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের প্রশাসন রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। এতে ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে দলটি সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে।
যে দলই জয়ী হোক, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ভোটারদের মনোভাব সম্পর্কে আগাম ধারণা দেবে। পাশাপাশি ২০২৮ সালের নির্বাচনে কোন ইস্যু ও প্রার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন, সে বিষয়েও ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
গভর্নর নির্বাচনের ফলও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে যারা ভালো ফল করবেন, তাদের জাতীয় পরিচিতি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।
সূত্র: এবিসি নিউজ
