‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ জন্য মুক্তিকামী দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তাদের আবারও লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
একই সঙ্গে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবি অবিলম্বে মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশনের আগেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতে সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেন শফিকুর রহমান। অন্যথায় জনগণের দাবি আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, দাবিগুলো মেনে নিয়ে সরকারকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে হবে। ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশনের আগেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলে আপাতত বিরোধী দলের আর কোনো কর্মসূচি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তবে তা না হলে জনগণের দাবি ও গণভোটে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অপমানিত হতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুবসমাজের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, তরুণেরা রাজপথে লড়াই করে জাতিকে সাময়িক মুক্তি এনে দিয়েছে। সেই মুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে তাদের আবারও লড়াই করতে হবে। কোনো পক্ষের প্ররোচনায় কান না দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
তিনি বলেন, তাঁরা কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত দাবি নিয়ে মাঠে নামেননি; জনগণের দাবি ও ভোগান্তির বিষয়গুলো সামনে আনতেই আন্দোলন করছেন। এর আগে দুটি লংমার্চ জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসায় সফল হয়েছে উল্লেখ করে তৃতীয় লংমার্চও সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সাত দফার মূল দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন
শফিকুর রহমান বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবির মূল বিষয় হলো গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। তাঁর দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাকি ছয় দফার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একটি দাবি বাস্তবায়িত হলে অন্য ছয়টি দাবির প্রয়োজন হতো না বলে তাঁরা মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি চাঁদাবাজি, দখলদারি, দুর্নীতি ও মাদক কারবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
বিএনপির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দলটি জাতিকে হতাশ করেছে এবং ঐতিহাসিক প্রতারণা করেছে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি কথা দিয়ে কথা রাখেনি; জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার করেছে এবং জাতির আকাঙ্ক্ষা ও গণরায়কে উপহাস করেছে।
শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপিকে গণরায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তা না হলে দলটিকে উচ্চ মূল্য দিতে হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, বিএনপি সম্ভবত সেই পরিণতির দিকেই এগোচ্ছে।
জামায়াত আমিরের অভিযোগ, বিএনপি অতীতের স্বৈরাচারী শাসন ও নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়নি। বরং প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করে জাতির দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, চার দিনের সফর শেষে দুই দিন আগে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। কী কারণে তিনি সফরে গিয়েছিলেন এবং সফর শেষে কী নিয়ে ফিরেছেন, তা জাতির সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো গোপনীয়তা রয়েছে কি না, তা জনগণ জানতে চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া যাবে না বলেও সতর্ক করেন জামায়াত আমির।
অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তারা এখন তার পরিণতি ভোগ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পাওয়া যাবে না।
সাত দফা দাবিতে লংমার্চ
সকাল ৭টায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। তিনি বলেন, জনগণের দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই এ লংমার্চের আয়োজন। অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। তা না হলে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ অন্য নেতারা। তবে সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ছয় স্থানে পথসভা, রাতে কুষ্টিয়ায় সমাপনী
আয়োজকদের কর্মসূচি অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে ছয়টি স্থানে পথসভা ও অনির্ধারিত সভা করার কথা রয়েছে। রাতে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শেষ হওয়ার কথা।
ঢাকা থেকে ছয় শতাধিক গাড়ি লংমার্চে অংশ নিয়েছে এবং পথে আরও প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রায় সোয়া চারশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রায় ১৯ জেলার নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় সকাল ৯টায় প্রথম পথসভা হওয়ার কথা। এরপর সকাল ১১টায় বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে দুপুর সাড়ে ১২টায় এবং ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বরে দুপুর ২টায় পথসভা হওয়ার কথা। এরপর যশোরের মুড়লীর মোড়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় এবং ঝিনাইদহের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড মোড়ে বিকেল ৫টায় পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
